হরমুজের পর মালাক্কা প্রণালি নিয়ে তৈরি হচ্ছে শঙ্কা
0
World

হরমুজের পর মালাক্কা প্রণালি নিয়ে তৈরি হচ্ছে শঙ্কা

April 19, 2026
Scroll

Posted 4 hours ago by

হরমুজ প্রণালি—যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ—নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবারও তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এই অচলাবস্থার মধ্যেই বৈশ্বিক বাণিজ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রুট, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালাক্কা প্রণালি, নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। এই প্রণালি সরাসরি দক্ষিণ চীন সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত এবং এর মধ্য দিয়েই বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্য চলাচল করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সিঙ্গাপুরের কাছে ফিলিপস চ্যানেল এলাকায় এর সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ২.৮ কিলোমিটার। সম্প্রতি মালাক্কা প্রণালি আবার আলোচনায় আসে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার আকাশসীমা ব্যবহার করে সামরিক উড়োজাহাজ চলাচলের জন্য বিস্তৃত অনুমতির প্রস্তাব দেয়। একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের পর এই প্রস্তাবটি দেওয়া হয়। তবে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি এখনও বিবেচনার পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পদক্ষেপ বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বৈশ্বিক গুরুত্ব: যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইনের গবেষক ও আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞ আজিফাহ আস্ত্রিনা বলেন, ‘মালাক্কা প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ভারত মহাসাগরকে প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা সবচেয়ে ছোট ও কার্যকর সমুদ্রপথ। ফলে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের জন্য এটি অপরিহার্য।’ যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে প্রতিদিন ২ কোটি ৩২ লাখ ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে নেয়া হয়েছে- যা সমুদ্রপথে বৈশ্বিক তেল পরিবহনের প্রায় ২৯ শতাংশ। এই একই সময়ে প্রতিদিন ২৬ কোটি ঘনমিটার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও পরিবহন হয়েছে এই পথ দিয়ে। যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন বিশেষজ্ঞ গোকি বালসি বলেন, এই পথ দিয়ে শুধু জ্বালানি নয়, ইলেকট্রনিকস, ভোগ্যপণ্য, শিল্পপণ্য, যন্ত্রপাতি ও গাড়িও পরিবহন হয়ে থাকে। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ গাড়ির বাণিজ্য এই পথ দিয়ে হয়। এছাড়া শস্য ও সয়াবিনের মতো শুকনো পণ্যও পরিবহন হয় এই প্রণালির মধ্য দিয়ে।’ বালসি আরো বলেন, ভৌগলিক, জ্বালানি পরিবহন, নানা ধরনের পণ্য পরিবহনের দিক থেকে হরমুজ প্রণালি গুরুত্বপূর্ণ হলেও মালাক্কার ভূমিকা আরো বিস্তৃত। ‘হরমুজ মূলত জ্বালানি রুট। কিন্তু মালাক্কা প্রণালি শুধু জ্বালানি নয় বরং বহুবিধ পণ্যের ট্রান্স-শিপমেন্ট কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।’ আস্ত্রিনা বলেন, ‘এটা বলা যেতেই পারে যে বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান পথগুলোর একটি হলো মালাক্কা প্রণালি।’ সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক রিক্যাপ তথ্য আদান-প্রদান কেন্দ্রের মতে, মালাক্কা ও সিঙ্গাপুর প্রণালিতে ২০২৫ সালে ১০৮টি জলদস্যুতা ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ। তাই এই প্রণালিতে জলদস্যুতা একটি চিরস্থায়ী উদ্বেগের বিষয়। এছাড়াও, এই এলাকাটি সুনামি ও আগ্নেয়গিরির মতো প্রাকৃতিক দূর্যোগের ঝুঁকিতেও রয়েছে। ২০০৪ সালের সুনামিতে এর দক্ষিণাঞ্চল ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কেন এখন উদ্বেগ: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মালাক্কার গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয় বরং ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। বালসি বলেন, ‘চীন, যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের মধ্যে সমুদ্র আধিপত্য নিয়ে উত্তেজনা বাড়লে এই পথ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।’ আস্ত্রিনা বলেন, ইন্দোনেশিয়ার আকাশসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি পেলে তা দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। তার গবেষণা মতে, মালাক্কা প্রণালির বর্তমান নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী দেশগুলোর মাঝের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সামাল দেওয়ার জন্য তৈরি নয়। এটি মূলত জলদস্যুতা, চোরাচালান ও সামুদ্রিক অপরাধ মোকাবিলার জন্য তৈরি করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মতো কোনো বড় শক্তি যখন এই অঞ্চলে নিজেদের কার্যক্রম ও উপস্থিতি বাড়ায়, তখন এমন একটি নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা সামাল দেওয়ার জন্য বর্তমান ব্যবস্থাটি তৈরি নয়।’ তবে স্বল্পমেয়াদে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা কম বলেও তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, ‘এখনই বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হবেনা, কারণ বাণিজ্য সচল রাখার স্বার্থ শক্তিশালী হওয়ায় সবাই সেটি বজায় রাখতে চায়।’ তার মতে, বড় ঝুঁকিটি রয়েছে দীর্ঘমেয়াদে। ‘উদ্বেগের বিষয় হলো, যদি চীন এটিকে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি বৃদ্ধির অবস্থান হিসেবে দেখে, তাহলে তারা প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। তবে সেটি সরাসরি বাণিজ্য বন্ধ করে নয় বরং এই অঞ্চলজুড়ে নিজেদের প্রভাব বাড়িয়ে তা করতে পারে।’ ‘ঝুঁকিটা সেখানেই। ধীরে ধীরে এমন এক পরিবর্তন দেখা যেতে পারে, যেখানে সহযোগিতামূলক ও আইনশৃঙ্খলাভিত্তিক নিরাপত্তা পরিবেশ বদলে গিয়ে তা রুপ নিতে পারে আরো প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, সরাসরি সংঘাত না হলেও এমন পরিবর্তনের বাস্তবিক প্রভাব থাকতে পারে। ‘বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পরোক্ষ হলেও শক্তিশালী হবে যেমন বীমা খরচ বাড়বে, ঝুঁকির ধারণা বাড়বে এবং এমন একটি জলপথে অস্থিরতা তৈরি হবে যার ওপর বিশ্ব অর্থনীতি ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।’ ইন্দোনেশিয়ার ভূমিকা সরলভাবে দেখাকে সতর্ক করেন তিনি। বলেন, ‘এটিকে এমনভাবে দেখার সুযোগ নেই যেন ইন্দোনেশিয়া কোনো এক পক্ষের সঙ্গে জোট বাঁধছে।’ ‘ইন্দোনেশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াচ্ছে, চীনের সঙ্গে শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখছে এবং অন্যদিকে রাশিয়ার মতো অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে ভারসাম্য বজায় রাখছে।’ ‘বাস্তবতা হলো মহাজোটগুলোর প্রতিযোগিতা এখন এমন এক অঞ্চলে প্রবেশ করছে, যা এতদিন বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য যৌথ ও কার্যকর করিডর হিসেবে পরিচালিত হয়ে এসেছে।’ মালাক্কা দ্বিধা: ২০০৩ সালে চীনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও '‘মালাক্কা ডিলেমা'’ শব্দটি ব্যবহার করেন তাদের এই নৌপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বোঝাতে। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং চায়না পাওয়ার প্রোজেক্ট-এর তথ্য অনুযায়ী, চীনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ তেল আমদানি এবং সমুদ্রপথে বাণিজ্যের মোট মূল্যের প্রায় ৬০ শতাংশ মালাক্কা প্রণালি ও দক্ষিণ চীন সাগর দিয়ে পরিবাহিত হয়। বালসি বলেন, ‘শুধু চীনই নয়। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও জ্বালানির জন্য এই প্রণালির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তাদের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল আমদানি এটির মধ্য দিয়ে আসে।’ তিনি আরো বলেন, এই নৌপথ সিঙ্গাপুরের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে রয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় ব্যস্ততম কনটেইনার বন্দর এবং এটি জাহাজের জ্বালানি সরবরাহের বড় কেন্দ্র। চীনের জন্য এই প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমানো বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করেন আস্ত্রিনা। তিনি বলেন, ‘নিকট ভবিষ্যতে চীনের পক্ষে বাস্তব অর্থে এই নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর কোনো কার্যকর উপায় নেই।’ তিনি বলেন। ‘পাইপলাইন বা অন্য কোনো করিডরের মতো বিকল্প পথ কিছুটা সহায়তা করতে পারলেও তা বৃহৎ পরিসরে মালাক্কার বিকল্প হতে পারবে না।’ বালসিও এতে একমত। তিনি বলেন, সুন্দা প্রণালি ও লম্বক প্রণালি যে দুটিই ইন্দোনেশিয়ার জলসীমায় অবস্থিত তারাই সবচেয়ে কার্যকর দুটি বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহার হতে পারে। পাপুয়া নিউগিনির নিকটে টরেস প্রণালি সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি অগভীর ও সংবেদনশীল জলপথ যেখানে প্রবালপ্রাচীর রয়েছে। ফলে সেখান দিয়ে বড় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতে পারে না। আর যদি জাহাজগুলোকে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া ঘুরে যেতে হয় সেক্ষেত্রে অত্যধিক সময় ও ব্যয় লাগবে বলে তিনি জানান। আস্ত্রিনা মনে করেন, এসব সীমাবদ্ধতার কারণে চীন এই দুর্বলতা দূর করার চেয়ে বরং তা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেদিকেই বেশি মনোযোগ দেবে। তিনি বলেন, ‘এই দ্বিধার মূল বিষয় নির্ভরতা কমানো নয় বরং চীন কীভাবে সেই নির্ভরতা পরিচালনা করে।’ এ কারণেই চীন শুধু বিকল্প পথ খোঁজার দিকে নয় বরং বৃহত্তর অঞ্চলে বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগর ও গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটগুলোতে নিজেদের প্রভাব ও উপস্থিতি বাড়ানোর দিকেও মনোযোগ দিচ্ছে বলেও মনে করেন আস্ত্রিনা। সূত্র: বিবিসি বাংলা

হরমুজের পর মালাক্কা প্রণালি নিয়ে তৈরি হচ্ছে শঙ্কা
BD24Live
BD24Live

Coverage and analysis from Bangladesh. All insights are generated by our AI narrative analysis engine.

Bangladesh
Bias: Unknown

People's Voices (0)

Leave a comment
0/500
Note: Comments are moderated. Please keep it civil. Max 3 comments per day.
You might also like

Explore More