
সীমান্ত বাণিজ্যে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি, সরকারের পদক্ষেপে নতুন আশা
April 5, 2026
BD24Live
কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দর ও শাহপরীর দ্বীপ করিডোরের দীর্ঘ বন্ধ থাকার প্রভাব সীমান্ত এলাকায় তীব্রভাবে পড়েছে। ১১ মাস ধরে বন্ধ থাকা স্থলবন্দর ও চার বছর ধরে নীরব শাহপরীর দ্বীপ করিডোরের কারণে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্য প্রায় থমকে গেছে। এতে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব ক্ষতি ৮০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকার মধ্যে ধরা হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে পাঠানো প্রায় ৯৩ লাখ ডলারের পণ্যও আটকে রয়েছে। সীমান্ত এলাকা নিয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, কেরুনতলী ও সাবরাং ইউনিয়নের নাফ নদীর তীরে একসময় জমজমাট বন্দর ও করিডোর এখন জনশূন্য। একসময় যেখানে ট্রাক, কার্গো বোট এবং শ্রমিকদের ভিড় থাকত, সেখানে এখন তালাবদ্ধ গুদামঘর আর ফাঁকা ঘাট দেখা যাচ্ছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বন্দর ও করিডোর ঘিরে গড়ে ওঠা ব্যবসায়ী, শ্রমিক, পরিবহন খাতের প্রায় অর্ধলাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। জীবিকার সংকটে অনেকে বিকল্প রোজগারের সন্ধানে ছুটছেন, যা সীমান্ত এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। মোহাম্মদ কাশেম, যিনি প্রায় ১০ বছর ধরে মিয়ানমার থেকে আসা পশুবাহী ট্রলার খালাসের কাজ করতেন, তিনি বলেন, ‘চার বছর ধরে করিডোর বন্ধ থাকায় প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় বন্ধ হয়ে গেছে। পরিবার নিয়ে কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে।’ এছাড়া, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের প্রায় ২৭০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে, যা বাণিজ্য ফেরানো আরও জটিল করছে। অবস্থা মোকাবেলায় সরকারের পদক্ষেপে কিছু আশা দেখা দিয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘স্থলবন্দর চালুর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে লাখো মানুষ কর্মহীন হয়েছেন এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী জানাচ্ছেন, ‘গত বছরের এপ্রিল থেকে সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ থাকায় আমাদের মাসে ৩০ লাখ টাকা করে প্রায় তিন কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।’ কাস্টমস ও স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে মিয়ানমার থেকে এসেছে ১,৯৯,২২৫ টন পণ্য, রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪০৪ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি মাত্র ১৫,৭৫৭ টন, রাজস্ব এসেছে ১০৮ কোটি টাকা। স্থানীয় শ্রমিক নেতা মোহাম্মদ করিম বলেন, ‘বন্দর চালু হওয়ার খবর শুনে আমরা খুশি। প্রায় ১০ হাজার শ্রমিকের জীবিকা এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল।’ এছাড়া ব্যবসায়ী ও ইন্ডাস্ট্রি নেতারা আশাবাদী যে, দ্রুত বন্দর চালু হলে কর্মসংস্থান ফিরবে এবং আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ীরা ক্ষতি কিছুটা মোকাবেলা করতে পারবে। অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ওমর ফারুক (সিআইপি) বলেন, 'সরকার বন্দর চালুর বিষয়ে আন্তরিক। আমরা আশাবাদী খুব শিগগিরই টেকনাফ সীমান্ত বাণিজ্য আবার চালু হবে। এতে একদিকে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান হবে, অন্যদিকে আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরাও লোকসান থেকে কিছুটা মুক্তি পাবেন।' কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী বলেন, 'টেকনাফ স্থলবন্দর চালুর উদ্যোগ অবশ্যই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে বন্দরের অনেক অবকাঠামো নষ্ট হয়ে গেছে, সেগুলো সংস্কারের উদ্যোগও নিতে হবে।' তিনি আরও বলেন, 'এখন প্রথম করণীয় হওয়া উচিত কয়েক বছর আগে ইস্যু করা ব্যাংক ড্রাফটের বিপরীতে মিয়ানমারে আটকে থাকা পণ্যগুলো নিরাপদে দেশে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা।' টেকনাফ স্থলবন্দর ও শাহপরীর দ্বীপ করিডোর আবার চালু হলে সীমান্ত এলাকার অর্থনীতি এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকা নতুনভাবে সচল হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

BD24Live
Coverage and analysis from Bangladesh. All insights are generated by our AI narrative analysis engine.