তেলের সংকট নাকি সিন্ডিকেটের খেলা?—জেলায় জেলায় মজুতের ভয়ঙ্কর চিত্র
World

তেলের সংকট নাকি সিন্ডিকেটের খেলা?—জেলায় জেলায় মজুতের ভয়ঙ্কর চিত্র

March 29, 2026
BD24Live
Scroll

দেশজুড়ে জ্বালানি তেল নিয়ে অস্থিরতার এই সময়ে প্রশ্নটা আর শুধুই সরবরাহ ঘাটতির নয়। প্রশ্নটা এখন আরও গভীর: সংকট কি বাস্তব, নাকি পরিকল্পিত? কারণ একদিকে সাধারণ মানুষ তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ফিরে যাচ্ছেন খালি হাতে, অন্যদিকে প্রশাসনের অভিযানে বারবার উঠে আসছে বিপরীত চিত্র—দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লুকিয়ে রাখা হয়েছে শত শত, কোথাও কোথাও হাজার লিটার জ্বালানি তেল। এ যেন ঘাটতি নয়, বরং ঘাটতির আড়ালে গড়ে ওঠা এক অদৃশ্য ব্যবসা। জেলায় জেলায় একই চিত্র: সংকট না কৃত্রিম মজুত? সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে যে চিত্র সামনে এসেছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—বরং একটি বিস্তৃত বাস্তবতার প্রতিফলন। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে এক মুদিদোকানির বাড়ি থেকে প্রায় ৩৭০ লিটার পেট্রল জব্দ করা হয়েছে; অভিযোগ—মজুত রেখে অতিরিক্ত দামে বিক্রি। এছাড়াও নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় প্রায় ৮০০ লিটার পেট্রল অবৈধভাবে মজুত করে লাইসেন্স ছাড়া বিক্রির দায়ে এক ব্যবসায়ীকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তাছাড়াও দিনাজপুরের বিরলে রাতের আঁধারে জ্বালানি তেল বিক্রির ঘটনায় অর্থদণ্ডের পাশাপাশি কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে একাধিক ব্যক্তিকে। এদিকে জামালপুরে তেল না পেয়ে ক্ষুব্ধ মোটরসাইকেল চালকেরা সড়ক অবরোধ করলে পরে একটি দোকানেই প্রায় ২ হাজার ৫০০ লিটার তেলের মজুত পাওয়া যায়; কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অভিযোগে জরিমানা করা হয় ৫০ হাজার টাকা। অন্যদিকে কুড়িগ্রামের রৌমারীতে আবার গোয়ালঘরে ড্রামভর্তি পেট্রল মজুতের অভিযোগে জরিমানা করা হয়েছে। এগুলো কারসাজি আলাদা নয়— বরং একটি ছড়িয়ে পড়া প্রবণতার সুস্পষ্ট প্রমাণ। অভিযান হচ্ছে, কিন্তু থামছে না কেন? যেখানে তেল মজুত আছে, সেখানে মানুষ তা পাচ্ছে না— এই বাস্তবতা শুধু বাজার ব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়। মজুত করে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া, বেশি দামে বিক্রির সুযোগ তৈরি করা, লাইসেন্সবিহীন বাণিজ্য- সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম সংকট। ফলাফল— সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে, আর একটি গোষ্ঠী অস্বাভাবিক মুনাফায়। সিন্ডিকেটের ছায়া কি অস্বীকার করা যায়? যখন একই ধরনের ঘটনা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পুনরাবৃত্তি হয়, তখন সেটিকে আর বিচ্ছিন্ন বলা যায় না। বরং প্রশ্ন জাগে— এর পেছনে কি একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করছে? এই মজুতদাররা এতটা সাহস পায় কোথা থেকে? তারা কি শুধু সুযোগ নিচ্ছে, নাকি কোথাও না কোথাও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতাই তাদের শক্তিতে পরিণত হয়েছে? অভিযান হচ্ছে, কিন্তু থামছে না কেন? প্রশাসন নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। জরিমানা করছে, কারাদণ্ড দিচ্ছে, জব্দ করা তেল বাজারে ছাড়ার উদ্যোগ নিচ্ছে। সবই ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়— এই অভিযানগুলো কি সমস্যার স্থায়ী সমাধান আনছে? কারণ এক জায়গায় অভিযান শেষ হতে না হতেই অন্য জায়গায় একই ঘটনা সামনে আসছে। এতে স্পষ্ট— সমস্যা গভীরে, আর তার শিকড় আরও বিস্তৃত। ভোগান্তির ভার সাধারণ মানুষের কাঁধে কেন? এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ। মোটরসাইকেল চালক, কৃষক, পরিবহন শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তাদের দৈনন্দিন জীবনই থমকে যাচ্ছে। জামালপুরে সড়ক অবরোধ— এটা শুধু ক্ষোভের প্রকাশ নয়, এটা এক ধরনের অসহায়তার ভাষা। আইন আছে, প্রয়োগ কতটা কার্যকর? পেট্রোলিয়াম আইন অনুযায়ী অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত দামে বিক্রি স্পষ্টত দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু বাস্তবতা বলছে— আইনের প্রয়োগ এখনও যথেষ্ট কঠোর নয়। যদি নিয়মিত নজরদারি থাকত, যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যেত, তাহলে কি এত সহজে হাজার লিটার তেল মজুত করা সম্ভব হতো? সংকট নয়, প্রয়োজন ব্যবস্থার শুদ্ধি: জ্বালানি তেলের এই অস্থিরতা কেবল অর্থনৈতিক নয়—এটি একটি নৈতিক সংকটও। যেখানে কিছু মানুষ সংকট তৈরি করে লাভবান হয়, আর সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে- সেখানে শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি শুদ্ধি অভিযান। কঠোর নজরদারি, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর শাস্তি ছাড়া এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়। নইলে এই সংকট বারবার ফিরে আসবে— নতুন নামে, নতুন কৌশলে। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা থেকেই যায়— তেলের সংকট, নাকি সংকটকে ঘিরে ব্যবসা? লেখক: রাশেদুল ইসলাম রাশেদ সাংবাদিক ও শিক্ষক (খোলা কলাম বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি২৪লাইভ ডট কম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

তেলের সংকট নাকি সিন্ডিকেটের খেলা?—জেলায় জেলায় মজুতের ভয়ঙ্কর চিত্র
BD24Live
BD24Live

Coverage and analysis from Bangladesh. All insights are generated by our AI narrative analysis engine.

Bangladesh
Bias: Unknown
You might also like

Explore More