
জাল সনদে শুরু, এখন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে
April 1, 2026
BD24Live
শিক্ষকতার মতো পবিত্র পেশায় যোগ দিতে যেখানে মেধা, যোগ্যতা ও সততা থাকা প্রধান শর্ত, সেখানে জাল বা ভুয়া সনদ ব্যবহার করে বছরের পর বছর সরকারি বেতন-ভাতা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার থাইংখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন শিক্ষা নিরীক্ষা ও পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএ) সাম্প্রতিক নিরীক্ষায় তার জমা দেওয়া কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদের সত্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি সরকারি নিরীক্ষায় ওই সনদকে জাল বা ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ভুয়া সনদ ব্যবহার করে চাকরি করার অভিযোগে তার কাছ থেকে প্রায় ২১ লাখ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর শিক্ষা প্রশাসন, স্থানীয় শিক্ষাঙ্গন এবং সচেতন মহলে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। এছাড়াও ভয়াবহ অভিযোগ আছে, নিজের কম্পিউটার দোকান থেকেই দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করা হতো বিভিন্ন ধরনের জাল বা ভুয়া প্রশিক্ষণ সনদ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের নিয়োগের সময় জমা দেওয়া কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সম্প্রতি একটি বিশেষ নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এই নিরীক্ষার আওতায় শিক্ষকদের জমা দেওয়া সনদের তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের ডাটাবেজ ও অফিসিয়াল রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। যেসব সনদের কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি অথবা প্রতিষ্ঠানের তথ্যের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি, সেগুলোকে জাল বা ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ডিআইএ প্রকাশিত ওই তালিকায় উখিয়ার থাইংখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো.

মোস্তফা কামালের নামও রয়েছে। তালিকায় তার ইনডেক্স নম্বর ১০২৮০৯৭ উল্লেখ করা হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তার জমা দেওয়া কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদের সত্যতা নিয়ে গুরুতর অসঙ্গতির কথা বলা হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, থাইংখালী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হওয়ার আগে মোস্তফা কামাল পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় তিনি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ হিসেবে একটি সনদ জমা দিয়ে শিক্ষক পদে নিয়োগ লাভ করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক নিরীক্ষায় দেখা গেছে, সেই সনদের কোনো বৈধ রেকর্ড পাওয়া যায়নি। ফলে তার শিক্ষকতা জীবনের শুরু থেকেই জাল বা ভুয়া সনদের অভিযোগ সামনে এসেছে। যে প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার, সেখানে নেই কোনো তথ্য: মোস্তফা কামাল তার কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ হিসেবে বগুড়াভিত্তিক জাতীয় কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ও গবেষণা একাডেমি (নেকটার)-এর নাম উল্লেখ করেছেন। তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছে, মোস্তফা কামাল নামে ওই সনদের কোনো প্রশিক্ষণার্থী বা উত্তীর্ণ ব্যক্তির তথ্য তাদের অফিসিয়াল রেকর্ডে নেই। প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তাদের অনলাইন ডাটাবেজেও ওই নামে কোনো নিবন্ধন বা সনদের তথ্য পাওয়া যায়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের অফিসিয়াল রেকর্ড ও অনলাইন ডাটাবেজ যাচাই করে দেখা হয়েছে। ওই নামে কোনো প্রশিক্ষণার্থী বা সনদধারীর তথ্য পাওয়া যায়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা সূত্রে জানা গেছে, জাল বা ভুয়া সনদ ব্যবহার করে যারা দীর্ঘদিন সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন, তাদের কাছ থেকে সেই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় মোস্তফা কামালের কাছ থেকে আদায়যোগ্য অর্থের পরিমাণ ২০ লাখ ৯৭ হাজার ৪৩০ টাকা। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত তিনি ওই অর্থ পরিশোধ করেননি। অনুসন্ধানে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। মোস্তফা কামালের নিজস্ব একটি কম্পিউটার দোকান রয়েছে, যার নাম 'মোস্তফা কম্পিউটার'। স্থানীয়দের দাবি, ওই দোকান থেকেই দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের জাল বা ভুয়া কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ তৈরি করা হতো। স্থানীয়রা জানান, বিভিন্ন চাকরিপ্রার্থী ওই দোকান থেকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ সংগ্রহ করেছেন। তাদের দাবি, এসব সনদের অধিকাংশেরই কোনো অনলাইন নিবন্ধন বা সরকারি স্বীকৃতি নেই। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, চাকরি হারানোর আশঙ্কায় মোস্তফা কামাল ইতোমধ্যে ঢাকায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং বিভাগীয় অফিসে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি ধামাচাপা দিতে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করার চেষ্টাও করছেন তিনি। চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহমুদ ইসলাম সুমন বলেন, জাল সনদ ব্যবহার করে সরকারি চাকরি লাভ করা বাংলাদেশের আইনে গুরুতর অপরাধ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪২০ ধারা অনুযায়ী প্রতারণার মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এই ধারায় দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। এছাড়া ৪৬৭ ও ৪৬৮ ধারা অনুযায়ী জাল দলিল তৈরি করা বা ব্যবহার করা গুরুতর অপরাধ। এসব ধারায় দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এমনকি কিছু ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে। তিনি আরও বলেন, যদি কেউ জাল সনদ ব্যবহার করে দীর্ঘদিন সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন, তাহলে সরকার সেই অর্থ পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি প্রশাসনিকভাবে চাকরিচ্যুত করার ক্ষমতাও রাখে। জেলা শিক্ষা অফিসারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অফিসের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তালিকায় যেসব শিক্ষকের নাম এসেছে, তাদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত মোস্তফা কামালের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে অভিযোগগুলো উল্লেখ করে তার হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি। এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের জমা দেওয়া কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদের সত্যতা যাচাইয়ের অংশ হিসেবেই এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। যেসব সনদের তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রেকর্ডের সঙ্গে মেলেনি, সেগুলোকে সন্দেহজনক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এবং সেগুলো নিয়ে আরও তদন্ত করা হবে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান বলেন, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা সংশ্লিষ্ট এইসব প্রতিবেদন হাতে পেলে তার ব্যবপারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
BD24Live
Coverage and analysis from Bangladesh. All insights are generated by our AI narrative analysis engine.