
ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ বাতিল এবং কর্পোরেট আগ্রাসন বন্ধের দাবি
April 7, 2026
BD24Live
ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাবিত ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ–২০২৫’ অবিলম্বে বাতিল করার দাবি জানিয়েছেন। ৭ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা অভিযোগ করেন যে, এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থার আড়ালে ক্ষুদ্রঋণ খাতকে ধ্বংস করার সুস্পষ্ট নীলনকশা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে এবং কোনো ধরনের কর্পোরেট আগ্রাসন মেনে নেওয়া হবে না। উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রণীত যে ১৬টি অধ্যাদেশকে অধিকতর শক্তিশালী করার জন্য স্থগিত রেখেছে তার মধ্যে ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ–২০২৫’ও রয়েছে।বক্তারা প্রশ্ন তোলেন, দেশে বিদ্যমান ৬৭টি ব্যাংক পরিচালনায় যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংককেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়, সেখানে শত শত এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনা হলে তা কীভাবে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা সম্ভব হবে।তারা আরও বলেন, অধ্যাদেশের মাধ্যমে ঝুঁকি সৃষ্টি না করে বরং সঞ্চয়ের সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও আর্থিকভাবে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে। একইসঙ্গে, পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি অ্যাক্টের আওতায় সার্টিফিকেট মামলা দায়েরের সুযোগ প্রদান করতে হবে যাতে অর্থ আত্মসাৎ প্রতিরোধ করা যায়। ক্ষুদ্রঋণ খাতের তদারকির দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে না দিয়ে বরং মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ), পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং এনজিও ব্যুরোর মতো বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং তাদের নিজস্ব কাঠামোর মধ্যেই তাদের কাজ করতে দিতে হবে।৭ এপ্রিল, মঙ্গলবার, ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে কোস্ট ফাউন্ডেশন, ইক্যুইটিবিডি এবং বিডিসিএসও প্রসেস কর্তৃক আয়োজিত “ক্ষুদ্রঋণকে ব্যাংকিং কাঠামোয় রূপান্তরের ঝুঁকি” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসকল দাবিসমূহ তুলে ধরেন। কোস্ট ফাউন্ডেশন-এর নির্বাহী পরিচালক ও ইক্যুইটিবিডি-এর প্রধান সঞ্চালক রেজাউল করিম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের ক্ষুদ্রঋণ পরিচালক সৈয়দ আমিনুল হক, ইক্যুইটিবিডির সমন্বয়ক ওমর ফারুক ভুইয়া, বিডিসিএসও প্রসেস-এর এম.

এ. হাসান সহ অন্যান্যরা। সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিডিসিএসও প্রসেস-এর মোস্তফা কামাল আকন্দ।রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো বা ব্যাংক ব্যালেন্স বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রকৃত উন্নয়ন হলো মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা। তিনি বলেন, এনজিওগুলো স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের জন্য বিদেশ থেকে যে ফান্ড আনার সুযোগ পায়, ব্যাংকগুলো কি সেই সুযোগ পাবে? তাছাড়া, যেখানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ (এনপিএল) প্রায় ৩৫ সেখানে ক্ষুদ্রঋণ খাতের এনপিএল গড়ে ৮-৯ এর উপরে নয়। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে এমন নজির বাংলাদেশে নেই। তাই ব্যাংকগুলোও এখন ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগকে সবচেয়ে নিরাপদ মনে করছে। ক্ষুদ্রঋণ সেক্টর লাখো মানুষের আত্মনির্ভরতা ও নারীর ক্ষমতায়ন জোরদার করেছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে, আমরা এই সেক্টরকে কর্পোরেট আগ্রাসনের ঝুঁকিতে ফেলতে দিতে পারিনা।সৈয়দ আমিনুল হক বলেন, “বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই ৬৭টি ব্যাংক রয়েছে, সেক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংকিং কাঠামোর আওতায় আনার প্রয়োজন কেন—এটি এক বড় প্রশ্ন। ব্যাংকগুলো মূলত মুনাফা লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হয় এবং পরিচালনা পর্ষদের রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে থাকে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকির সৃষ্টি করতে পারে। দেশে প্রায় ৭০০টির মতো এনজিও কার্যক্রম চালাচ্ছে, অথচ বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কারো সঙ্গে আলোচনা না করে, মতামত না নিয়ে মাত্র কয়েকটি বড় এনজিও ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের পরামর্শের ভিত্তিতে এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছে। এটি শুধু ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোরই নয়, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আমরা দাবি করছি, এই অধ্যাদেশ অবিলম্বে বাতিল করা হোক।”মোস্তফা কামাল আকন্দ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, প্রস্তাবিত ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ ২০২৫’ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। প্রথমত, ক্ষুদ্রঋণের মূল লক্ষ্য হলো দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক উন্নয়ন, যা ব্যাংকিং কাঠামোয় মুনাফা-চালিত হয়ে প্রান্তিক মানুষদের সেবার বাইরে ঠেলে দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং নিয়ম ও জটিলতা দ্রুত ও সহজলভ্য সেবাকে বাধাগ্রস্ত করবে। তৃতীয়ত, এনজিওদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার কাজ ব্যাংকিং মডেলে গুরুত্ব হারাবে, যা গ্রামীণ উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।ওমর ফারুক ভুইয়া বলেন, গত তিন দশক ধরে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত বৈদেশিক তহবিল ছাড়াই স্বনির্ভরভাবে পরিচালিত হচ্ছে। দেশের মোট জিডিপিতে এই খাতের অবদান প্রায় ১৭ শতাংশ। প্রতিদিন প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়, যার প্রায় ৪০ শতাংশই গ্রুপ সদস্যদের সঞ্চয় থেকে আসে। এ খাতে প্রায় ৫ লক্ষ কর্মী নিয়োজিত রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ খাতকে গুটি কয়েক বড় এনজিও বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না।এম.এ. হাসান বলেন, এনজিওগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম শুধু ঋণ প্রদানে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জলবায়ুজনিত দুর্যোগ মোকাবিলাসহ নানা সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ব্যাংকিং কাঠামোয় রূপান্তরিত হলে এসব মানবিক ও সামাজিক উদ্যোগ গুরুত্ব হারাতে পারে, যা গ্রামীণ জনপদের সামগ্রিক উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
BD24Live
Coverage and analysis from Bangladesh. All insights are generated by our AI narrative analysis engine.