
0
কচ্ছপের ডিম পাড়ার স্থানে রিসোর্ট, মারমেইডে প্রশাসনের অভিযান
April 11, 2026
BD24Live
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সংরক্ষিত বালিয়াড়ি দখল করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগে আলোচিত মারমেইড বিচ রিসোর্টের অংশবিশেষ উচ্ছেদ করেছে প্রশাসন। শনিবার সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে দিনব্যাপী চলে এ অভিযান। এতে রামু উপজেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অংশ নেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকলেও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়ায় প্যাঁচারদ্বীপ এলাকার বালিয়াড়িতে একের পর এক স্থাপনা গড়ে তোলে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ। অবশেষে সরকারি নির্দেশনার ভিত্তিতে ওইসব স্থাপনার একটি অংশ ভেঙে ফেলা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জীববৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থে ১৯৯৯ সালে কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক থেকে টেকনাফের বদরমোকাম পর্যন্ত প্রায় ১২০ কিলোমিটার সমুদ্রসৈকতকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আইন অনুযায়ী, এই এলাকায় কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণের আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রামু উপজেলার প্যাঁচারদ্বীপ এলাকায় অনুমতি ছাড়াই মারমেইড বিচ রিসোর্ট গড়ে তোলা হয়। সেখানে আবাসিক হোটেল, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়, যা সরাসরি ইসিএ আইনের পরিপন্থী। পরিবেশবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্যাঁচারদ্বীপ এলাকার বালিয়াড়ি কেবল একটি পর্যটন এলাকা নয়, বরং এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাকৃতিক আবাসস্থল। এখানে একসময় বিপুল পরিমাণ লাল কাঁকড়ার বিচরণ ছিল এবং সমুদ্র কচ্ছপ ডিম পাড়তে আসত নিয়মিত। কিন্তু রিসোর্টের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। রাতে আয়োজন করা উচ্চ শব্দের অনুষ্ঠান, অতিরিক্ত আলোকসজ্জা এবং মানুষের অবাধ বিচরণে কচ্ছপের ডিম পাড়ার পরিবেশ নষ্ট হয়। ধীরে ধীরে এলাকা থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করে লাল কাঁকড়াও। পরিবেশকর্মী কলিম উল্লাহ বলেন, এই ধরনের এলাকায় বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরি হলে শুধু দৃশ্যপটই বদলায় না, পুরো বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভূমি অফিসের নথিপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, রিসোর্টটি শুধু ইসিএ আইন লঙ্ঘনই করেনি, সরকারি খাস জমিও দখল করেছে। রামুর ধেচুয়াপালং ইউনিয়ন ভূমি অফিস একাধিকবার বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রতিবেদন দেয়। ২০২৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা সলিম উল্লাহর সই করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মারমেইড কর্তৃপক্ষ এক নম্বর খাস খতিয়ানের জমিতে অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ করছে। নির্মাণকাজে বাধা দিলে তারা সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ রাখলেও পরে আবার তা শুরু করে। এর আগেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রামুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন জেলা প্রশাসক গিয়াস উদ্দিনের সই করা চিঠিতে বলা হয়, প্যাঁচারদ্বীপ এলাকায় রিসোর্টটির দখলে প্রায় সাত একর সরকারি জমি রয়েছে এবং নিয়ম অনুযায়ী তা উচ্ছেদের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে স্থানীয় ভূমি অফিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাস্তবে দখলের পরিমাণ আরও বেশি। তার দাবি, কাগজে সাত একর বলা হলেও বাস্তবে অন্তত ১০ একরের মতো সরকারি জমি দখলে রয়েছে। অভিযানে অংশ নেওয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের পরিদর্শক মুছাইব ইবনে রহমান বলেন, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় বালিয়াড়ি দখল করে একাধিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিল। আইনের ভিত্তিতেই সেসব স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। পর্যায়ক্রমে অবৈধ সব স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয়দের একটি অংশ বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ, প্রতিবেদন ও নির্দেশনা থাকার পরও কেন এত দেরিতে ব্যবস্থা নেওয়া হলো, তা স্পষ্ট নয়। তাদের মতে, সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলে পরিবেশের ক্ষতি এতটা হতো না। রুহুল আমিন নামের একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, বছরের পর বছর ধরে এসব নির্মাণ হয়েছে, তখন কেউ দেখেনি। এখন এসে ভাঙা হচ্ছে- এতে ক্ষতি তো আগেই হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কক্সবাজারের মতো সংবেদনশীল উপকূলীয় এলাকায় ইসিএ আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া জীববৈচিত্র্য রক্ষা সম্ভব নয়। পর্যটন উন্নয়নের নামে যদি বালিয়াড়ি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল দখল হতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। তাদের মতে, শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালালেই হবে না, একই সঙ্গে নিয়মিত নজরদারি, জবাবদিহি এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

BD24Live
Coverage and analysis from Bangladesh. All insights are generated by our AI narrative analysis engine.